চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা কেন হবেন? জন মালিন্সের ৬টি প্রথা-বিরোধী কার্যকরী কৌশল – Abu Musa Al Rahi

আমাদের দেশে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর একজন শিক্ষার্থীর ওপর সবচেয়ে বড় যে সামাজিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, তার নাম ‘চাকরি’। সে বিসিএস হোক, ব্যাংক জব হোক বা কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কর্পোরেট পজিশন—সবাই যেন এক অঘোষিত দৌড় প্রতিযোগিতায় শামিল। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন কি, সবাই যদি শুধু চাকরিই খোঁজে, তবে চাকরি দেবে কে? দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করতে এবং অর্থনীতিকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তরুণ উদ্যোক্তা।

অনেকে মনে করেন উদ্যোক্তা হওয়া মানেই বিজনেস স্কুলের কঠিন সব থিওরি মুখস্থ করা বা কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট জোগাড় করা। কিন্তু বাস্তব জগতটা একটু ভিন্ন। প্রখ্যাত লেখক ও লন্ডন বিজনেস স্কুলের প্রফেসর জন মালিন্স (John Mullins) তাঁর বিখ্যাত একটি টেড (TED) টকে এমন ৬টি ‘কাউন্টার-কনভেনশনাল’ বা প্রথা-বিরোধী মানসিকতার কথা বলেছেন, যা প্রথাগত বিজনেস স্কুলের ধারণার চেয়ে একদম আলাদা। এই আর্টিকেলে আমরা সেই ৬টি কৌশল এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. “হ্যাঁ, আমরাও পারি” (Saying ‘Yes’ to Opportunity)

প্রথাগত ব্যবসায়িক শিক্ষায় শেখানো হয় আপনার যে বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা (Core Competency) আছে, শুধুমাত্র তাতেই ফোকাস করতে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের দুনিয়ায় অনেক সময় সুযোগ আগে আসে, আর দক্ষতা অর্জন করতে হয় পরে। জন মালিন্স এখানে ব্রাজিলের একজন উদ্যোক্তা আর্নল্ড কোরেইয়ার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি মূলত ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতেন। কিন্তু যখন তাঁর একজন গ্রাহক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২৬০টি স্টোরে লাইভ ট্রেনিং সম্প্রচারের কথা বললেন, তখন স্যাটেলাইট প্রযুক্তি সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা সত্ত্বেও আর্নল্ড বলেছিলেন, “হ্যাঁ, আমরা এটা করতে পারি”। পরবর্তীতে তিনি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওয়ালমার্টের মতো বড় কোম্পানির সাথে কাজ করেছেন।আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় নিজেদের পঠিত বিষয়ের বাইরে কিছু করতে ভয় পায়। হয়তো আপনি বিবিএ বা আর্টস পড়ছেন, কিন্তু আপনার সামনে আইটি বা কৃষিনির্ভর কোনো ব্যবসার দারুণ সুযোগ এলো। তখন “আমি তো এই বিষয়ে কিছু জানি না” বলে পিছিয়ে না গিয়ে, “হ্যাঁ, আমি পারব এবং শিখে নেব” এই মানসিকতা ধারণ করা উচিত। যেমন, আপনি যদি টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের না হয়েও দেখেন যে আপনার এলাকায় ই-কমার্স ডেলিভারির বড় সমস্যা আছে, তবে আপনি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সেই লজিস্টিক সেবা শুরু করতে পারেন। উদ্যোক্তা হতে হলে সব আগে থেকে জানতে হয় না, বরং কাজ শুরু করে দিয়ে শেখার মানসিকতা থাকতে হয়।

২. প্রোডাক্ট নয়, আগে সমস্যার সমাধানে ফোকাস করা (Problem-first Logic)

বড় কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের বিদ্যমান প্রোডাক্টের ছোটখাটো পরিবর্তন করে সেটাকে ‘নতুনত্ব’ বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু প্রকৃত উদ্যোক্তারা প্রোডাক্টের চেয়ে মানুষের নির্দিষ্ট ‘সমস্যা’ বা ‘পেইন পয়েন্ট’ সমাধানে বেশি মনোযোগ দেন। জনাথন থর্ন নামের একজন সার্জন খেয়াল করলেন, অপারেশনের সময় চিমটা বা ফোরসেপস মানুষের টিস্যুর সাথে আটকে যায়। তিনি এই সমস্যার সমাধান হিসেবে একটি বিশেষ সংকর ধাতু তৈরি করেন যা পরবর্তীতে নিউরোসার্জনদের কাছে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়।আমাদের দেশে কেউ একটি ফুড কার্ট বা এফ-কমার্স পেজ খুলে সফল হলে, অন্যরাও অন্ধভাবে সেটি কপি করতে শুরু করে। এটি কোনো উদ্ভাবন নয়। এর বদলে আপনার চারপাশের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। উদাহরণস্বরূপ, গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা থাকার জায়গা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। আপনি যদি শুধু একটা ‘অ্যাপ’ বানানোর চিন্তা না করে, এই রোগীদের জন্য স্বল্পমূল্যে থাকার বা যাতায়াতের সুব্যবস্থা করার বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, তবে সেটিই হবে প্রকৃত সফল উদ্যোগ। প্রোডাক্ট কী হবে তা পরে ভাবুন, আগে মানুষের সমস্যাটা কী সেটা শনাক্ত করুন।

৩. ছোট বাজার দিয়ে শুরু করুন (Think Narrow, not Broad)

বড় কোম্পানিগুলো সবসময় বিশাল মার্কেট বা বড় বাজারের দিকে ফোকাস করে। কিন্তু সফল উদ্যোক্তারা শুরু করেন একদম ছোট ও নির্দিষ্ট একটি টার্গেট অডিয়েন্স নিয়ে। নাইকি (Nike)-এর প্রতিষ্ঠাতাদ্বয় শুরুতে সবার জন্য জুতো বানাননি। তারা শুধু ‘এলিট দূরপাল্লার দৌড়বিদদের’ নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য জুতো তৈরি করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তারা অন্যান্য খেলাধুলায় যুক্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে রাজত্ব কায়েম করে।আপনি যখন ব্যবসা শুরু করবেন, তখন পুরো বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষকে আপনার ক্রেতা ভাবার দরকার নেই। বরং খুব ছোট এবং নির্দিষ্ট একটি গ্রুপকে টার্গেট করুন। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইনে সাধারণ জামাকাপড় বিক্রি না করে শুধুমাত্র ‘মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য আরামদায়ক অ্যাপ্রন’ বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রয়িং টুলস’ নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজন মেটানোর জন্য একটি ছোট সেবা চালু করুন। ছোট পরিসরে সফল এবং বিশ্বস্ত হয়ে উঠলে পরে তা পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সহজ হবে।

৪. কাস্টমারের টাকায় ব্যবসা বড় করা (Asking for the Cash)

“আমার কাছে তো পুঁজি নেই”—এটি আমাদের দেশের নবীন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় অজুহাত। কিন্তু জন মালিন্স দেখাচ্ছেন কীভাবে মূলধনের অভাব দূর করা যায়। ইলন মাস্কের টেসলা (Tesla) যখন তাদের প্রথম গাড়ি ‘রোডস্টার’ বানানোর পরিকল্পনা করে, তখন তারা গাড়ি তৈরির আগেই কাস্টমারদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্ডার এবং পেমেন্ট নিয়ে ১ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিল। একেই বলে ‘কাস্টমার ফান্ডেড বিজনেস’।পুঁজি বা ইনভেস্টরের অপেক্ষায় বসে না থেকে আপনি প্রি-অর্ডার বা সাবস্ক্রিপশন মডেলের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকেই প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন। আপনি যদি কাস্টমাইজড ফার্নিচার, হস্তশিল্প বা কোনো সফটওয়্যার সার্ভিস দিতে চান, তবে শুরুতেই বড় শোরুম বা অফিসের দরকার নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার আইডিয়া বা স্যাম্পল ডিজাইন দেখিয়ে অর্ডারের সময় অগ্রিম পেমেন্ট নিন। সেই টাকা দিয়েই কাঁচামাল কিনুন এবং পণ্য ডেলিভারি দিন। এতে নিজের পকেট থেকে ইনভেস্ট করার ঝুঁকি যেমন কমে, তেমনি ব্যবসার চাহিদাও আগেভাগে বোঝা যায়।

৫. সম্পদের মালিক না হয়ে ব্যবহার করতে শিখুন (Beg or Borrow, Don’t Buy)

বিজনেস স্কুলে শেখানো হয় কত টাকা ইনভেস্ট করতে হবে এবং তার বিপরীতে কত টাকা লাভ (ROI) আসবে। কিন্তু বুদ্ধিমান উদ্যোক্তারা সম্পদ কেনার বদলে ধার বা লিজ নেওয়ার পথ বেছে নেন। যুক্তরাজ্যের ‘গো এইপ’ (Go Ape) ব্যবসার মালিকরা বিশাল বনভূমি বা গাছ না কিনে ফরেস্ট্রি কমিশনের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তাদের সম্পদ ব্যবহার করে একটি সফল অ্যাডভেঞ্চার পার্ক তৈরি করেছিলেন। স্টার্টআপ শুরু করার জন্য শুরুতেই লাখ লাখ টাকা খরচ করে অফিস ভাড়া নেওয়া বা দামী যন্ত্রপাতি কেনার প্রয়োজন নেই। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব, বন্ধুদের ভালো ক্যামেরা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত স্পেস আপনি চুক্তির ভিত্তিতে বা শেয়ারিং মডেলে ব্যবহার করতে পারেন। যেমন, আপনার যদি ক্লাউড কিচেন ব্যবসা করার ইচ্ছা থাকে, তবে আলাদা জায়গা ভাড়া না নিয়ে এলাকার কোনো রেস্তোরাঁ যারা শুধু রাত ও দুপুরে খাবার পরিবেশন করে, তাদের সাথে কথা বলে সকালের সময়টা তাদের রান্নাঘর ব্যবহারের অনুমতি নিতে পারেন। নিজের টাকা জমানোর চেয়ে অন্যের বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করে ব্যবসা দাঁড় করানো অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

৬. অনুমতির অপেক্ষায় না থেকে কাজ শুরু করে দেওয়া (Just Get On With It)

বড় কোম্পানিগুলোতে নতুন কিছু করতে গেলে নানা আইনি জটিলতা বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু উদ্যোক্তারা অনুমতির জন্য বসে না থেকে কাজ শুরু করে দেন। উবার (Uber)-এর প্রতিষ্ঠাতা যদি আগে সব দেশের সরকারের কাছে গিয়ে ট্যাক্সি ছাড়া ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার অনুমতি চাইতেন, তবে তারা হয়তো কোনোদিন শুরুই করতে পারতেন না। যদিও আইন মেনে চলা আবশ্যক, কিন্তু যখন উদ্ভাবন কোনো অস্পষ্ট বা পুরনো আইনের জালে আটকে থাকে, তখন উদ্যোক্তারা কাজ শুরু করে দিয়ে প্রমাণ করেন যে এটি মানুষের জন্য প্রয়োজন। আমাদের দেশে ট্রেড লাইসেন্স, টিন (TIN), ভ্যাটসহ নানা আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা দেখে অনেকে ভয়ে কাজ শুরু করেন না। অনেক সময় দারুণ আইডিয়াগুলো শুধু এই ‘অনুমতি’ বা ‘কাগজপত্র’ ঠিক করার চক্করে পড়ে আঁতুড়ঘরেই মরে যায়। আপনার প্রোডাক্ট বা সেবাটি যদি নীতিগতভাবে সঠিক হয় এবং মানুষের উপকারে আসে, তবে একদম ছোট পরিসরে একটি ‘প্রোটোটাইপ’ বা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কাজ শুরু করে দিন। যখন আপনার উদ্যোগটি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং বড় হতে শুরু করবে, তখন পর্যায়ক্রমে আইনি বিষয়গুলো সম্পন্ন করে নিতে পারবেন। আগে কাজ করে প্রমাণ করুন, অনুমতি এমনিতেই আসবে।

পরিশেষে,জন মালিন্সের এই ৬টি প্রথা-বিরোধী মানসিকতা বা মাইন্ডসেট যেকোনো দেশের মানুষের জন্য প্রযোজ্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য এগুলো হতে পারে দারুণ এক দিকনির্দেশনা। মজার ব্যাপার হলো, এই গুণগুলো জন্মগতভাবে পাওয়া যায় না, বরং এগুলো চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা সম্ভব।আমাদের দেশের বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উচিত শুধুমাত্র চাকরির বাজারে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখা। একটি সমস্যা খুঁজে বের করুন, ছোট একটি বাজার নিয়ে কাজ শুরু করুন, উদ্ভাবনী উপায়ে মূলধন সংগ্রহ করুন এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যান। আপনার এই ছোট একটি উদ্যোগই হয়তো আপনার নিজের বেকারত্ব ঘোচানোর পাশাপাশি একদিন বদলে দিতে পারে পুরো দেশের অর্থনীতি।

মনে রাখবেন, বড় কিছু করার জন্য আপনাকে বড় হয়ে শুরু করতে হবে না, বরং শুরু করার অদম্য ইচ্ছা থাকলেই আপনি একদিন বড় হতে পারবেন। আগামীর বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে আপনাদের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে।

Author
Abu Musa Al Rahi
Entrepreneur | Founder @ B Collaborator
Website: www.theabumusa.com

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top